
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন অংশে দিন দিন ভাঙন তীব্র হচ্ছে। লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত ১৫টি অংশে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, কোথাও বালু সরে বড় গর্ত ও খালের মতো জলধারা তৈরি হয়েছে। ভাঙনের সঙ্গে বিলীন হচ্ছে বালিয়াড়ি ও ঝাউগাছও।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছরে সৈকতের বালুচর উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। লাবণী পয়েন্টের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী মফিজুর রহমানের দাবি, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয় বলছে, শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বালিয়াড়ি শক্তিশালী হলে তা ঢেউয়ের আঘাত থেকে সৈকতকে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করতে পারে।
কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হক বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বড় ঢেউয়ের আঘাতে জিও ব্যাগের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
ভাঙনের কারণে পর্যটকদেরও ভোগান্তি বাড়ছে। সৈকতের বিভিন্ন অংশে গর্ত ও খাল তৈরি হওয়ায় হাঁটা এবং গোসলের জায়গা কমে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জিও ব্যাগের কারণে চেয়ার-ছাতা ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়ছেন।
গবেষণায়ও কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা উঠে এসেছে। ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরে এ উপকূলে ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি সমুদ্রে বিলীন হয়েছে। বিপরীতে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে ২৮৪ হেক্টর এলাকায়।
গবেষকেরা বলছেন, ঢেউ, সাগরের স্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কক্সবাজারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৫ দশমিক ০৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
সমুদ্রবিজ্ঞানী ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষকেরা বলছেন, শুধু কৃত্রিম বাঁধের ওপর নির্ভর না করে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ, সৈকতে বালি পুনঃস্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সমুদ্রভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে।