
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে সাগরের ভাঙনে চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে প্রবল ঢেউ ও জোয়ারের পানিতে জেলেপাড়াসহ আশপাশের পাঁচ গ্রামের বসতবাড়ি, গাছপালা, রাস্তাঘাট ও নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই একটু একটু করে সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভাঙন। কোথাও বসতঘরের অর্ধেক সাগরে বিলীন হয়েছে, আবার কোথাও ঘরের দেয়াল ঘেঁষে ঢুকে পড়ছে জোয়ারের পানি। ঘর হারিয়ে অনেক পরিবার আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে জীবিকার প্রধান উৎস মাছ ধরা হওয়ায় নতুন জায়গায় বসতি গড়ার সামর্থ্য নেই তাদের।
ভাঙনের কারণে নিরাপদ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেক নলকূপ সাগরে চলে গেছে, আর যেগুলো টিকে আছে সেগুলো জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়। ফলে ভাটার সময় দূরের নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিকভাবে সাগরের ঢেউ ও পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল খননে নিয়মিত বালু উত্তোলনের কারণেও ভাঙন বাড়তে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে এ দাবির বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো বৈজ্ঞানিক বা সরকারি তদন্তের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
পরিবেশ আন্দোলন-বাপার কক্সবাজার জেলা শাখার নেতৃবৃন্দরা জানান, ভাঙনে বসতবাড়ির পাশাপাশি গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীর ওপরও প্রভাব পড়ছে। মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর থাকায় উপকূলীয় ভাঙন দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটায় মোট ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও প্রায় ১৮ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার প্রয়োজন। কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে জরুরি সংস্কারের অনুমতি পাওয়া গেছে এবং কাজও শুরু হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়ায় এসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় প্রকল্পের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে বাঁধ সংস্কারের পরিবর্তে পুরো উপকূলীয় এলাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।