
নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক পর্যায় হলো মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তি। সাধারণত মধ্যবয়সে টানা ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকলে মেনোপজ হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়। তবে এ সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ সামান্য হলেও অন্যদের ঘুম, কর্মক্ষমতা, পারিবারিক জীবন ও সামগ্রিক জীবনমান ব্যাহত হতে পারে।
প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর বিশ্ব মেনোপজ দিবস পালিত হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো মেনোপজ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, উপসর্গের যথাযথ মূল্যায়ন এবং নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া মেনোপজের প্রধান কারণ। এ সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমে যায় এবং মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয় অপসারণ, কেমোথেরাপি, নির্দিষ্ট ধরনের রেডিওথেরাপি, কিছু জিনগত ও অটোইমিউন রোগের কারণেও স্বাভাবিক সময়ের আগে মেনোপজ হতে পারে। ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মেনোপজের উপসর্গ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাসিকের অনিয়ম, হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যাওয়া, রাতে ঘাম, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি, যোনিপথের শুষ্কতা, যৌনমিলনে ব্যথা এবং পেশি ও অস্থিসন্ধিতে অস্বস্তি। কারও ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ কয়েক মাস স্থায়ী হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে চলতে পারে।
মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল, ধূমপান ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয় হৃদ্রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা ও মানসিক অস্বস্তি থাকলেও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে পারে।
সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ধূমপান পরিহার মেনোপজের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, মাছ, ডিম, ডাল ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা ও শক্তিবর্ধক ব্যায়াম হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা এবং গরম লাগার সমস্যা কমাতে হালকা পোশাক পরা ও ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
যোনিপথের শুষ্কতায় প্রয়োজনে পানিভিত্তিক লুব্রিক্যান্ট বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যায়। প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা হলে পেলভিক ফ্লোরের ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে নিজে থেকে হরমোন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম বা ভেষজ সম্পূরক গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকিৎসকেরা সাধারণত উপসর্গ, বয়স ও মাসিকের ইতিহাস মূল্যায়ন করে মেনোপজ শনাক্ত করেন। প্রত্যেক নারীর জন্য হরমোন পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। উপসর্গের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা, স্থানীয় চিকিৎসা কিংবা হরমোনবিহীন ওষুধ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে হরমোন চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়; ব্যক্তিগত রোগের ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
টানা ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকার পর আবার রক্তপাত বা বাদামি স্রাব দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একইভাবে অস্বাভাবিক রক্তপাত, তীব্র যোনিপথের শুষ্কতা, প্রস্রাবের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ব্যাঘাত বা বিষণ্নতা দেখা দিলেও অবহেলা করা উচিত নয়।
মেনোপজ নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা দূর করতে পরিবার, গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের উচিত নারীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও চিকিৎসা গ্রহণে সহযোগিতা করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেনোপজ বিষয়ে পরামর্শ, উপসর্গ মূল্যায়ন এবং হাড় ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিরূপণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
মেনোপজ নারীর জীবনের স্বাভাবিক অধ্যায় হলেও এ সময়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক জীবনযাপন, সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নারীর জীবনমান উন্নত করতে পারে।
লেখক: ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক এবং জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।