
ইসলামে উপহার আদান-প্রদানকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উপহার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিদ্বেষ দূর করতেও ভূমিকা রাখে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একে অপরকে উপহার দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। হাদিসে এসেছে, উপহার মনের মলিনতা দূর করে। এমনকি প্রতিবেশীকে সামান্য কিছু উপহার দিলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ২১৩০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৬)
তবে ইসলামে উপহার দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রেও হালাল-হারাম ও ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। উপহারের আড়ালে ঘুষ, সুদ কিংবা অন্যায় সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, বিশেষ চার ধরনের উপহার দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রথমত, সরকারি দায়িত্ব পালনের সূত্রে উপহার গ্রহণ নিষিদ্ধ। সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের কারণে কারও কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করলে তা ঘুষের পর্যায়ে পড়তে পারে। হাদিসে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৭)
আবু হুমায়দ আস-সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) ইবনু উতবিয়া নামের এক ব্যক্তিকে সদকা সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দায়িত্ব শেষে তিনি বলেছিলেন, কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য, আর কিছু তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে নবীজি (সা.) প্রশ্ন করেন, তিনি নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে বসে থাকলে কি এমন উপহার পেতেন? এ ঘটনার মাধ্যমে দায়িত্বের কারণে পাওয়া উপহারের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪২৫)
দ্বিতীয়ত, চাকরি, সুপারিশ বা কোনো উপকারের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। কাউকে বৈধ কাজে সহযোগিতা করা কিংবা কারও জন্য সুপারিশ করা ভালো কাজ। তবে সেই উপকারের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করলে তা অনৈতিক লেনদেনে পরিণত হতে পারে।
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করার কারণে উপহার পেলে এবং তা গ্রহণ করলে সে সুদের একটি বড় দরজায় প্রবেশ করল। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১) এ শিক্ষা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিঃস্বার্থভাবে উপকার করা উচিত।
তৃতীয়ত, ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। বিপদে কাউকে ঋণ দেওয়া প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু ঋণ দেওয়ার কারণে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে বাড়তি অর্থ, উপহার বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়া সুদের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.) ঋণদাতাকে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সামান্য উপহারও গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করেছেন, কারণ তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৪২) সুনান ইবনু মাজাহর একটি বর্ণনায়ও ঋণ দেওয়ার পর ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে উপঢৌকন বা বাহন ব্যবহারের সুবিধা গ্রহণ না করার নির্দেশ এসেছে। তবে আগে থেকেই পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদানের স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকলে সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
চতুর্থত, সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করে উপহার দেওয়া ইসলামি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, আচরণ ও উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখা। যথার্থ কারণ ছাড়া এক সন্তানকে বেশি বা দামি উপহার দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা উচিত নয়।
সন্তানদের উত্তম শিক্ষা ও শিষ্টাচার শেখানোর গুরুত্বও ইসলামে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সুনান আত-তিরমিজির একটি হাদিসে সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শেখানোকে মূল্যবান দান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫২)
নু’মান ইবনু বশীর (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, তাঁর বাবা তাঁকে বিশেষভাবে কিছু দান করলে তাঁর মা বিষয়টি নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে যান। নবীজি (সা.) জানতে চান, অন্য সন্তানদেরও একই ধরনের দান করা হয়েছে কি না। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে তিনি আল্লাহকে ভয় করতে এবং সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে বলেন। পরে তাঁর বাবা সেই দান প্রত্যাহার করে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৬)
ইসলামে উপহার আদান-প্রদান ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বাড়ানোর মাধ্যম হলেও এর আড়ালে ঘুষ, সুদ কিংবা বৈষম্যের সুযোগ নেই। তাই উপহার দেওয়ার পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও ন্যায়সংগততা বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।