
সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহনে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাটের বিকল্প হিসেবে খুরুশকুলে নির্মিত নতুন জেটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নতুন জেটি চালু হলে জোয়ার-ভাটার কারণে জাহাজ চলাচলের বাধা কমার পাশাপাশি পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হতে পারে। তবে নিরাপত্তা রেলিং স্থাপন এবং জেটিতে যাতায়াতের সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই এটি চালু করা যাচ্ছে না।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন জেটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে জেটির সিঁড়িতে রেলিং না থাকায় যাত্রীদের সাগরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি জেটিতে যাতায়াতের পথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম বিভাগ ও কক্সবাজার নদীবন্দরের উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, খুরুশকুলের নতুন জেটি পরিদর্শনে কিছু নিরাপত্তাগত সমস্যা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিঁড়িতে রেলিং না থাকার বিষয়টি অন্যতম। আগামী দিনের বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরা হবে। তাঁর ভাষ্য, জেটির প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। রেলিং স্থাপন করা হলে সেখান থেকে জাহাজ চলাচল সম্ভব হবে। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে জেটি চালু করা যাবে না। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য উদ্বোধনের কথা শোনা গেলেও তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এতদিন সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজ কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে চলাচল করে আসছে। তবে ঘাটটির পানির গভীরতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে জাহাজ চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী গোলাম রব্বানী জানান, নুনিয়াছড়া জেটিতে জোয়ারের সময় পানির গভীরতা প্রায় ছয় মিটার থাকলেও ভাটার সময় তা কমে চার মিটারে নেমে আসে। অথচ জাহাজ চলাচলের জন্য অন্তত পাঁচ মিটার গভীরতা প্রয়োজন। এ কারণে ভাটার সময় সেখান থেকে জাহাজ ছাড়তে পারে না।
অন্যদিকে, খুরুশকুলের মহেশখালী চ্যানেলে নির্মিত নতুন জেটিতে জোয়ারের সময় পানির গভীরতা আট মিটার এবং ভাটার সময় ছয় মিটার থাকে। ফলে ভাটার সময়ও সেখান থেকে জাহাজ চলাচলের মতো পর্যাপ্ত পানির গভীরতা রয়েছে। গোলাম রব্বানী বলেন, নুনিয়াছড়া ঘাটের জায়গা তুলনামূলক ছোট হওয়ায় একসঙ্গে অনেক যাত্রীর চাপ সামলানো কঠিন। খুরুশকুলের নতুন জেটিতে এ ধরনের সমস্যা কম হবে।
খুরুশকুলে দুটি জেটি নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা। বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী গোলাম রব্বানীর তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। জেটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন কিছু ফিনিশিং কাজ, বিদ্যুৎ ও সোলার লাইট স্থাপন এবং রেলিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলকারী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুরও নতুন জেটি ব্যবহারের পক্ষে। তিনি বলেন, খুরুশকুল থেকে জাহাজ চলাচল করলে সময় বাঁচবে, জোয়ার-ভাটার সমস্যা থাকবে না এবং যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।
তাঁর মতে, নুনিয়াছড়া ঘাটে জোয়ার ছাড়া জাহাজ ছাড়ার সুযোগ নেই। সেখানে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের চাপ সামলানো কঠিন। আট থেকে দশটি জাহাজ চলাচল করলেও একটির পর একটি জাহাজ ভিড়তে হয়। এতে যাত্রী ওঠানামায় ভোগান্তি তৈরি হয়। খুরুশকুলের নতুন জেটি চালু হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমবে। তবে নতুন এলাকায় যাতায়াতের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে জাহাজ মালিকদের পক্ষ থেকে আবেদনও করা হয়েছে।
খুরুশকুলের নতুন জেটিতে পৌঁছাতে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ফলে পর্যটকদের যাতায়াতের পথে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার অঞ্চলের পুলিশ সুপার নিশাত অ্যাঞ্জেলা বলেন, জেটি ও জাহাজে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলে ট্যুরিস্ট পুলিশ তা পালন করতে পারবে। তবে সড়কের নিরাপত্তার দায়িত্ব জেলা পুলিশের।
এদিকে, সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহনে এবার পরিবেশগত ছাড়পত্র, জাহাজের নিরাপত্তা, যাত্রী ধারণক্ষমতা এবং অনলাইন ট্রাভেল পাসের মতো একাধিক শর্ত যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ চলাচলের ঘাট পরিবর্তনের পরিকল্পনাও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। খুরুশকুলের নতুন জেটি চালু হলে নুনিয়াছড়া ঘাটের জোয়ার-ভাটার সীমাবদ্ধতা কাটতে পারে। তবে তার আগে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, সড়কে পর্যটকদের যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক নয়ন শীল।