কক্সবাজারের টেকনাফে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো লাইনের কাছে নাফ নদীর তীরবর্তী লবণ মাঠে পৌরসভার প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রস্তাবিত স্থান পুনর্মূল্যায়ন, গণশুনানি এবং বিকল্প সরকারি জমি বিবেচনার দাবিতে ১২ অক্টোবর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে গণস্বাক্ষরসংবলিত আবেদন জমা দিয়েছেন তাঁরা। এর আগে একই দাবিতে টেকনাফ পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
আবেদনকারীরা জানান, তাঁরা পৌর ভবন নির্মাণ বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছেন না। তবে নাগরিকদের যাতায়াত, যোগাযোগব্যবস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্যোগঝুঁকি ও কারিগরি উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে ভবনের স্থান নির্ধারণের দাবি তাঁদের। সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় বাসিন্দাদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করেই নাফ নদীর তীরবর্তী লবণ মাঠে পৌরসভার প্রশাসনিক ভবন স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রস্তাবিত স্থানটি পৌরবাসীর যাতায়াতের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। পৌর এলাকার মধ্যবর্তী ও সহজে যাতায়াতযোগ্য স্থানে ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, তাঁদের দাবি উপেক্ষা করা হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আবেদনকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টেকনাফ পৌরসভার ৩০তম সাধারণ সভার কার্যবিবরণী নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, উপস্থিতি ও স্বাক্ষরের বিষয়গুলো পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পরে ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের এক স্মারকে পৌর ভবন নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়িত এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনপত্রে টেকনাফ মৌজার দিয়ারা খতিয়ান নম্বর ৬৩৪, নামজারি খতিয়ান নম্বর ২৫-১০৯৯৬ এবং দিয়ারা দাগ নম্বর ৩৯২০-এর এক একর নাল জমিতে ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে স্থান নির্বাচন ও নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিপত্রের নির্দেশনা ও শর্ত প্রতিপালনের বিষয়টিও অনুমোদনপত্রে বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত জমি পৌরসভাকে দান করার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণীতে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির এক একর জমি বিনামূল্যে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার সম্মতির কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ২ জুলাই ১৬৪৩ নম্বর দলিলের মাধ্যমে কায়ুকখালীপাড়ার আইয়ুব আলী সওদাগরের ছেলে আবু মুসা এক একর জমি টেকনাফ পৌরসভাকে দান করেন বলে দলিলে উল্লেখ রয়েছে। দলিলে গ্রহীতা হিসেবে পৌরসভার পক্ষে মেয়রের নাম রয়েছে। কার্যবিবরণীতে জমিদাতার নাম এবং দলিলে উল্লেখিত নামের এই পার্থক্য যাচাই করে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকেরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রস্তাবিত জমি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। একটি পোস্টে পৌরসভার গাড়ি রাখার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৫০ শতক জমি দানের কথা উল্লেখ করে আপত্তিকারীদের সমালোচনা করা হয়েছে। তবে জমি দানসংক্রান্ত বক্তব্য ও দলিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে প্রস্তাবিত জমির নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিকদের প্রবেশাধিকার, দুর্যোগঝুঁকি ও কারিগরি উপযোগিতা যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থান নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অনুমোদন, কারিগরি সমীক্ষা এবং প্রকল্প ও দরপত্র-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আবেদনকারীরা স্থানীয় বাসিন্দা, নাগরিক প্রতিনিধি ও সচেতন মহলের অংশগ্রহণে গণশুনানি আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন। সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মতামত নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের আওতাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন টেকনাফ পৌর এলাকার পরিত্যক্ত কিংবা অব্যবহৃত সরকারি জমি যাচাই করে বিকল্প স্থান নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন আবেদনকারীরা। পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ও গণশুনানিতে বর্তমান স্থান অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলে বিকল্প জমিতে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাঁদের।
আবেদনের অনুলিপি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য, সংশ্লিষ্ট বিজিবি কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার, টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। মানববন্ধনে পৌর নাগরিকদের পক্ষে বক্তব্য দেন সাংবাদিক নূরুল করিম রাসেল, মো. রফিকুল ইসলাম, আবদুর রহমান, মো. জাহেদ, আবছার হোসেন, আহমদ শফি, মোজাম্মেল হক ও মোহাম্মদ মোবারক হোসেনসহ অনেকে।
BanglaDock