ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি পিএইচপিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা একটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগানোর পদ্ধতি মাত্র দুই দিনে খুঁজে পেয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এত দিন ত্রুটিটি সম্পর্কে সতর্কবার্তা থাকলেও, সেটি কাজে লাগানোর কৌশল বের করা ছিল অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এআইয়ের সহায়তায় সেই বাধা অতিক্রম হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালের জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা গবেষক স্টিফান এসার পিএইচপিতে গুরুতর ত্রুটির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে পাসওয়ার্ড ও ডেটাবেস চুরি কিংবা পুরো ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হতে পারে। পরবর্তী সময়ে একই ধরনের আরও কিছু ত্রুটি শনাক্ত হলেও সেগুলোর পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
গত ৩০ জুলাই এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফের গবেষকেরা ওপেনএআইয়ের ‘প্যাচ দ্য প্ল্যানেট’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বৃহৎ ভাষা মডেলকে পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেন। ১ আগস্টের মধ্যে গবেষকেরা ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে আক্রমণ চালানোর একটি পদ্ধতি খুঁজে পান। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি কৌশল শনাক্ত হয়। গুগল-সমর্থিত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজও একই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পিএইচপির দুর্বলতা কাজে লাগানোর নতুন পদ্ধতি খুঁজে পায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার নিরাপত্তা প্যাচ প্রকাশের পাশাপাশি গবেষণার ফলাফলও সামনে আনা হয়। তবে এআইয়ের দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত ও কাজে লাগানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে হ্যাকাররাও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ভিয়াস সেকার বলেন, এআই মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত এ ধরনের কাজ করতে পারে। পিএইচপির মতো আরও অনেক নিরাপত্তা দুর্বলতা রয়েছে, যেগুলো কাজে লাগানো সম্ভব। এর কিছু সম্পর্কে জানা গেলেও বেশির ভাগই এখনো অজানা।
পিএইচপি ওয়েবসাইট পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত একটি প্রোগ্রামিং ভাষা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটে এটি ব্যবহৃত হয়। ফলে এ প্রযুক্তির নিরাপত্তা দুর্বলতা ওয়েবসাইট, ব্যাংকিং, ক্লাউড সেবা ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
গবেষকেরা জানান, সার্ভারের মেমোরি শেষ হয়ে ক্র্যাশ করলে আগের কিছু তথ্য মেমোরিতে থেকে যেতে পারে। পিএইচপির সংশ্লিষ্ট ত্রুটির কারণে ওই তথ্য ব্যবহার করে ডেটা ফাঁস কিংবা ক্ষতিকর কোড চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য সার্ভারের মেমোরি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ক্র্যাশ করানোসহ বেশ কিছু জটিল ধাপ অতিক্রম করতে হতো। এআই অল্প সময়ের মধ্যে এ ধরনের বাধা অতিক্রমের একাধিক পদ্ধতি শনাক্ত করেছে।
এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফের গবেষক রায়ান অস্টিন জানান, পিএইচপির দুর্বলতা খুঁজতে তাঁরা বিশেষভাবে তৈরি কোনো মডেল ব্যবহার করেননি; সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য একটি মডেলই ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, এআই দিয়ে নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করার ঝুঁকি বিবেচনায় অ্যানথ্রোপিক তাদের উন্নত মডেল ‘মিথোস’ প্রকাশ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা প্যাচ প্রকাশের পরও ঝুঁকি পুরোপুরি কেটেছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম মেয়ার্স বলেন, পিএইচপির অনেক পুরোনো সংস্করণ এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নতুন প্যাচ দিয়ে সব ধরনের সমস্যা সমাধান করা কঠিন হতে পারে।
মেয়ার্সের মতে, পিএইচপি থেকে অন্য কোনো প্রযুক্তিতে স্থানান্তর ব্যয়বহুল ও জটিল। কারণ, এ ভাষায় তৈরি অ্যাপ্লিকেশনগুলো নতুন প্রযুক্তিতে নিতে হলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো অ্যাপ্লিকেশন নতুন করে তৈরি করতে হবে। তাই নিয়মিত নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ এবং সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই একদিকে যেমন সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে সেগুলো সমাধানে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে একই সক্ষমতা সাইবার অপরাধীদের হাতেও বিপজ্জনক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ ও সক্রিয় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
BanglaDock