বাংলাদেশে তুলনামূলক কম বয়সে আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে বড় কোনো অসুস্থতার ইতিহাস না থাকলেও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার ও কিডনি জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। এসব রোগে আক্রান্তদের একটি বড় অংশের মৃত্যু ঘটে ৭০ বছর বয়সের আগেই।
অসংক্রামক রোগকে সাধারণত বয়স্কদের সমস্যা মনে করা হলেও এখন তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও এসব রোগের প্রকোপ বাড়ছে। জিনগত, শারীরিক, পরিবেশগত ও আচরণগত নানা কারণ এর সঙ্গে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ এবং বায়ুদূষণ এসব রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক
অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ ধীরে ধীরে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরের সমস্যাও।
হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের মাংসপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এ অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক হয়। এ জন্য আগে থেকেই বড় কোনো রোগে আক্রান্ত থাকা জরুরি নয়; আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ব্যক্তিরও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বুকের মাঝখানে ক্রমাগত ব্যথা, ব্যথা বাম হাত ও ঘাড়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া, চোয়াল ও পিঠে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব বা বমি। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
স্ট্রোক
হৃদরোগের পর স্ট্রোকও মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক এক নয়। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের সমস্যা থেকে হয়। কোনো কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি হলেও এখন তরুণ এমনকি শিশুদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। স্ট্রোকের ধরন ও ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে এবং কতটা জায়গাজুড়ে ক্ষতি হয়েছে তার ওপর।
হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, হাত ওপরে তুলতে না পারা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, মুখ বেঁকে যাওয়া, গিলতে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো, বমি বা খিঁচুনি স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানোর সুযোগ থাকে।
ডায়াবেটিস
বাংলাদেশে সব বয়সী মানুষের মধ্যেই ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা এক কোটি ৩৮ লাখের বেশি। রোগীর মোট সংখ্যার হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম।
আইডিএফের অনুমান অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়ে দুই কোটি ২৩ লাখে পৌঁছাতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রতি ১০০ তরুণ-তরুণীর মধ্যে সাতজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ
অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির মতো দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগও অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ফুসফুসের সমস্যায় ভুগলেও তা সম্পর্কে সচেতন নন।
আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এসব রোগের প্রকোপ বেশি। গোবর, ঘুঁটে ও কাঠের মতো জ্বালানি ব্যবহার এবং ধূমপানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পুরুষদের মধ্যে এ ধরনের রোগের প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি।
ক্যানসার
বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ক্যানসার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে এক লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হন এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ।
বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজার। ২০১৮ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ক্যানসারে মৃত্যুর হারও বেড়েছে।
পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখের ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার বেশি দেখা যায়। এছাড়া ফুসফুস, কণ্ঠনালী ও পাকস্থলীর ক্যানসারও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যুর কারণ।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে অকাল মৃত্যু কমাতে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনেক অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অকাল মৃত্যু প্রতিরোধে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো।
তার মতে, শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্রাবসহ অন্যান্য পরীক্ষা করতে হবে। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক মৃত্যু ঠেকাতে সচেতনতার পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
BanglaDock