`
ঢাকা | বাংলাব্দ
COX'S BAZAR WEATHER

কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতিবছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 2, 2026 ইং
কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতিবছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত
ad728

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটি কক্সবাজার। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এই জেলায় দ্রুত কমছে ছোট-বড় পুকুর ও জলাধারের সংখ্যা। দখল, মাটি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর। একই সঙ্গে প্রতিবছর ১০ থেকে ১১ ফুট করে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এতে বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট এবং পরিবেশগত ঝুঁকি।


পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাণিজ্যিকভাবে মাটি ভরাট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব পুকুর ও জলাধার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এর প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় তাপমাত্রার ওপর।


কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় সদর ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে প্রায় সাড়ে ৯ বিঘার একটি সরকারি পুকুরও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে পুকুরটির পাড়ের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে আয়তন কমেছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ এই পুকুর ব্যবহার করেন। প্রতি হাটবারে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজারে।


জেলায় কমছে পুকুরের সংখ্যা


সরকারি নথি অনুযায়ী, কক্সবাজারে ১০ হাজার ৬৩৭টি পুকুরের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে ৯ হাজার ৫৬০টি। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই এক হাজারের বেশি পুকুর কমেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমানে জেলায় পুকুরের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি নয়।


জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে মোট ৯ হাজার ৫৬০টি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৮৮৭টি, কুতুবদিয়ায় ৬৩২টি, কক্সবাজার সদরে ৮৮৪টি, রামুতে ১ হাজার ৯৮০টি, উখিয়ায় ৮৮০টি, মহেশখালীতে ১৯৯টি, পেকুয়ায় ৩ হাজার ৩১৭টি এবং টেকনাফে ৮১৬টি।


অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, তখন জেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৩৭টি। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৫ হাজার ৬০টি, কুতুবদিয়ায় ১ হাজার ৬৬৬টি, কক্সবাজার সদরে ৯৩৩টি, রামুতে ৮৮৮টি, উখিয়ায় ৮৬৫টি, মহেশখালীতে ৫৭০টি, পেকুয়ায় ৩৮০টি এবং টেকনাফে ২৭৫টি পুকুর ছিল।


জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছর যেভাবে পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে, তা জেলার জন্য উদ্বেগের বিষয়। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় ধরনের পুকুর ভরাটের কারণে সুপেয় পানি ও পরিবেশগত সংকট বাড়ছে।


পুকুর কমায় বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি


পুকুর ও জলাধার কমে যাওয়ায় শহর ও জনবসতিতে পানি নিষ্কাশনের ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পুকুর বা জলাশয় কমে গেলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। পুকুর শুধু পানি ধরে রাখার স্থান নয়, এর নিজস্ব একটি প্রতিবেশব্যবস্থাও রয়েছে।


তার মতে, বৃষ্টির সময় পুকুর প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করে এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে জলাধার স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। জলাধার কমে গেলে নগর এলাকায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপের প্রভাব বাড়তে পারে।


কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, শুধু তাপমাত্রার ওঠানামাকে পুকুর কমে যাওয়ার একক কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও নগরের তাপীয় পরিবেশে প্রভাব ফেলে।


আইনে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ


পুকুর ভরাট বন্ধে প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও আইনি বিধান থাকলেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এ প্রবণতা। কোথাও অভিযান চালিয়ে ভরাট বন্ধ ও পুকুর পুনরুদ্ধার করা হলেও কিছুদিন পর আবার মাটি ফেলার অভিযোগ উঠছে।


প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, পুকুর, জলাশয়, নদী বা খাল ভরাট করা বেআইনি। প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন, ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তরও নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে প্রতিবছর


কক্সবাজারে পুকুর ও জলাশয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দ্রুত নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। জেলা শহরসহ ৯ উপজেলার ৭২ ইউনিয়নের অনেক এলাকায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।


কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর জানান, পুকুর ও জলাশয় ভরাট, অনাবৃষ্টি এবং বাড়তি তাপমাত্রার কারণে সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে।


শহরের বিভিন্ন এলাকায় অনেক অগভীর নলকূপ ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১১ ফুট করে নিচে নামছে। এক দশক আগে শহরের টেকপাড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া গেলেও এখন পানির জন্য ৩০০ ফুটের বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে।


সাগরপাড়ের কলাতলী এলাকাতেও গত কয়েক বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে নেমেছে। এতে তিন শতাধিক আবাসিক হোটেলের অসংখ্য পানির পাম্প অকেজো হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পুকুর-জলাশয় ভরাটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ


ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পুকুর, লেক ও নদীর পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।


আবুল মনজুর জানান, কক্সবাজারে সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনের জন্য একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে, যা পৌরসভার মোট পানির চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে।


এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চলছে। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পানির চাহিদা পূরণে পৃষ্ঠপানি জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পর্যাপ্ত জলাধার থাকা জরুরি। কক্সবাজারে পুকুর ও জলাধার ভরাটের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানি-নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত তাপের মতো সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

সূত্র : বাসস।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : BanglaDock

কমেন্ট বক্স
কক্সবাজার আদালতপাড়ায় ময়লা পানি ও আবর্জনার স্তূপ, দুর্ভোগে হা

কক্সবাজার আদালতপাড়ায় ময়লা পানি ও আবর্জনার স্তূপ, দুর্ভোগে হা