পর্যটননগরী কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ করে কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের পুরো ও আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটারের কক্সবাজার পৌরসভার আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের আওতায় আসবে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।
প্রস্তাবিত সীমানায় কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, ঝিলংজা ও পিএমখালী ইউনিয়ন এবং রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনিক প্রস্তাব অনুযায়ী, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের উমখালী, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও চেইন্দা মৌজার ১৮ বর্গকিলোমিটার এবং খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ধেছুয়াপালং মৌজার ৪৭ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আসবে। এ ছাড়া খুরুশকুল ইউনিয়নের ২৩ দশমিক ৬৭, পিএমখালী ইউনিয়নের ২৭ দশমিক ২৫ এবং ঝিলংজা ইউনিয়নের ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পৌরসভা বর্তমানে ১২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পৌরসভার জনসংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৫। তবে পৌরসভার প্রশাসনিক প্রতিবেদনে শহরে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাসের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত তিন দশকে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর বিস্তারে কক্সবাজার শহরের বাস্তব পরিধি পৌরসভার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে দ্রুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠছে। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, পর্যটননগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কক্সবাজারকে ঘিরে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার শহরে মানুষের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মী ও পরিবহনশ্রমিকদের কর্মকাণ্ডে নগর ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়। ফলে বৃহত্তর নগর এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরের নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জলাভূমি ও পর্যটন অবকাঠামোর সমন্বয় জরুরি। তা না হলে বিদ্যমান পরিবেশ-প্রতিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জেলার জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে। ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত পর্যটননগরী গড়ে তোলা এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মহাপরিকল্পনার কাজ শেষ হবে।
সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হলে বৃহত্তর নগর এলাকার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা, বাজার ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো বিষয়গুলো একটি প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক সড়ক ও ফুটপাত উন্নয়ন, গণশৌচাগার, পার্কিং, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পর্যটক নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও সমন্বিতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক রেজাউল করিম মোহাম্মদ তারেক বলেন, শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে বর্জ্য ও দূষণ অন্যতম। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে এ সমস্যার দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।
গত ৩১ আগস্ট প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ গণশুনানি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম শেষ হলে পরবর্তী মাসে কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দেশের ১৪তম সিটি করপোরেশন।
কক্সবাজার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন, প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণে গণশুনানি চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই সীমানা চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার সফর করতে পারেন বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী। তিনি জানান, সফরে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধন এবং কক্সবাজার ব্লু ইকোনমি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারেন। এর মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের ঘোষণাও আসতে পারে।
তবে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ, পাহাড় ও জলাভূমি রক্ষা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, কক্সবাজার শুধু আয়তন ও প্রশাসনিক পরিচয়ে বড় হবে না, বাড়বে নাগরিক সেবার মান ও নগরের বাসযোগ্যতাও।
BanglaDock