বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ ও পথসভা করেছে। আগামী দুই মাসে আরও তিনটি বিভাগে একই ধরনের কর্মসূচি এবং নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে জোটটি। এসব কর্মসূচিতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হলেও শুরু থেকেই সরকারবিরোধী বড় আন্দোলনের ইঙ্গিত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোটের নেতারা। কর্মসূচির শুরুতে ঢাকার সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ‘ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে’। অন্যদিকে চট্টগ্রামের লালদিঘীর সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন হবে না’।
এদিকে সরকারও কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। জাতীয় সংসদে লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই আগে এমন কর্মসূচি আয়োজন করত।
সরকারের সন্দেহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন বলেন, লংমার্চকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সুযোগ নিয়ে অঘটন ঘটাতে পারে—এমন তথ্য সরকারের কাছে ছিল। এ কারণে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, যাতে কেউ সরকার পতন বা সরকারের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতি করতে না পারে।
লংমার্চে জোটের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস সংকট নিরসন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এসব দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচিকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছে। তবে জামায়াত-এনসিপির নেতাদের দাবি, সরকারের কর্মকাণ্ড ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই তারা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর সিলেট অভিমুখে আরও তিনটি লংমার্চ হবে। চার বিভাগে লংমার্চ শেষে নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে জোটটি। সেখান থেকেই পরবর্তী কর্মসূচি বা নতুন ঘোষণা আসতে পারে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই গণভোটের রায় অস্বীকার করেছে। তার মতে, সাধারণত কোনো সরকারের কিছু সময় পার হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে, কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতিই তাদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন এবং ছয় মাসের মধ্যে জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন হয়নি। তার দাবি, সরকার গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করে ‘ইচ্ছেমতো চলার’ প্রবণতা দেখাচ্ছে।
আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস—এমন যুক্তি দিয়ে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তার মতে, বহু প্রাণের বিনিময়ে যে গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার চেয়ে বড় কারণ আর হতে পারে না।
সব মিলিয়ে, ছয় দফা দাবিকে সামনে রেখে ধারাবাহিক লংমার্চ এবং নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা আগামী দিনে জামায়াত-এনসিপি জোটের আন্দোলন কোন দিকে নেয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
BanglaDock