আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে থাকা কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশন অবকাঠামো থেকে বারবার বৈদ্যুতিক কেবল ও যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা ঘটছে। রানওয়ের উত্তর প্রান্তে বঙ্গোপসাগর ও বাঁকখালী নদীর মোহনায় পাইলিংয়ের ওপর স্থাপিত ক্যাটাগরি-২ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম থেকে এসব চুরির ঘটনায় বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা অডিটের আগে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাত, কুয়াশা কিংবা কম দৃশ্যমানতার মধ্যে উড়োজাহাজকে নিরাপদে রানওয়েতে অবতরণে সহায়তা করে এই লাইটিং সিস্টেম। এর বিভিন্ন অংশ থেকে বারবার কেবল ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিমান পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠকে বিমানবন্দরের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে সমুদ্রে স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমে বারবার চুরির অভিযোগ তুলে ধরে অবকাঠামোটির নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে চুরির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কক্সবাজার সদর মডেল থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী। এ বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিমানবন্দরের লাইট চুরির ঘটনা উন্নয়ন ব্যাহত করার কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে উড়োজাহাজ অবতরণের জন্য অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিমান পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত এ ধরনের স্থাপনার নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নৌ টহল, আধুনিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
চুরির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন বিমানবন্দরের আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরাও। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে যাওয়া একটি বিমানবন্দরে এত নিরাপত্তার মধ্যেও কীভাবে লাইট চুরির ঘটনা ঘটছে। একই এলাকার ব্যবসায়ী সব্বির আহমদও ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে রানওয়ে সম্প্রসারণ, সমুদ্রে পাইলিংয়ের ওপর অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম নির্মাণ, আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল, ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন এবং আধুনিক নেভিগেশন ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
সর্বশেষ সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সামগ্রিক কার্যক্রমেও কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অবকাঠামো থেকে বারবার কেবল ও যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
BanglaDock