`
ঢাকা | বাংলাব্দ
COX'S BAZAR WEATHER

কক্সবাজারে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে চলছে অনুমোদনহীন স্লিপার বাস

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 10, 2026 ইং
কক্সবাজারে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে চলছে অনুমোদনহীন স্লিপার বাস ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত
ad728

সরকারি অনুমোদন ও নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড না মেনে কক্সবাজারে বেশ কিছু স্লিপার বাস চলাচল করছে। সাধারণ এসি বাস হিসেবে অনুমোদন ও ফিটনেস সনদ নেওয়ার পর অনুমোদন ছাড়াই কিছু বাসের কাঠামোগত পরিবর্তন করে সেগুলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।


সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা ও ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় এবং কক্সবাজারে চলন্ত স্লিপার বাসে হঠাৎ আগুন লাগার ঘটনা গণমাধ্যমে আসে। এসব ঘটনার পর গত ২৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তেজগাঁও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে রূপান্তরিত স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনার পরও কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে স্লিপার বাস চলাচল করছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি নির্দেশনার পরও এসব বাস কীভাবে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে কতটা কার্যকর নজরদারি করছে।


স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের কলাতলী থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন রুটে এসব বাস ছেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বাসগুলোর মূল কাঠামো পরিবর্তনের পর পরিবর্তিত অবস্থার জন্য নতুন করে অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে কি না কিংবা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বাসগুলোর কারিগরি সক্ষমতা ও ফিটনেস যাচাই করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে সাধারণ এসি বাস হিসেবে অনুমোদন নেওয়ার পর সেটিকে স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।


কক্সবাজারে ঘুরতে আসা ইউনুস নামে এক বাসপ্রেমী বলেন, অনুমোদনহীনভাবে রূপান্তরিত বাসে যাতায়াতকারী যাত্রীরা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিতেই থাকছেন না; জরুরি পরিস্থিতিতে বাস থেকে দ্রুত বের হওয়ার পথ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে রাতের যাত্রায় দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে অনুমোদিত নকশার বাইরে পরিবর্তন করা বাসে যাত্রীদের নিরাপদে বের করে আনা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।


তিনি আরও বলেন, বাসের মূল নকশায় পরিবর্তন আনা হলে এর ওজন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে বাস নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, ব্রেকিং সক্ষমতায় প্রভাব কিংবা দুর্ঘটনার সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তার মতে, যাত্রীদের আরাম ও সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার আগে বাসের নিরাপত্তা ও কারিগরি বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি।


স্লিপার বাসের এক যাত্রী সঞ্চিতা বলেন, দীর্ঘ পথের যাত্রায় স্লিপার বাসের আরাম ও সুবিধার কারণেই তারা এসব বাসে ভ্রমণ করেন। কিন্তু বাসটি আদৌ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত কি না, কিংবা কাঠামোগত পরিবর্তনের পর নতুন করে ফিটনেস পরীক্ষা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ যাত্রীদের অনেকেই জানেন না। তিনি বলেন, এতদিন বিষয়টি জানার প্রয়োজনও মনে হয়নি। এখন এসব বাস অনুমোদনহীন হতে পারে—এমন তথ্য জানার পর বিষয়টি নিয়ে খারাপ লাগছে এবং যাত্রী হিসেবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সড়কে চলাচলকারী কোনো যানবাহনের কাঠামো পরিবর্তন করা হলে তা বিআরটিএর অনুমোদন এবং নির্ধারিত কারিগরি শর্তের আওতায় আনতে হবে। অনুমোদিত নকশার বাইরে বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন করা হলে তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের আওতায় পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি বাসের মূল কাঠামো পরিবর্তনের পর সেটি আগের ফিটনেস সনদের ভিত্তিতে চলাচল করতে পারবে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও কারিগরি যাচাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।


কক্সবাজার থেকে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলোর অনুমোদন, নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সচেতন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শুধু বাসের কাগজপত্র থাকলেই হবে না; বাসটি যে অবস্থায় বর্তমানে সড়কে চলাচল করছে, সেই পরিবর্তিত কাঠামোও অনুমোদিত ও কারিগরি দিক থেকে নিরাপদ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।


তাদের ভাষ্য, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনহীন যানবাহন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় রাতে চলাচলকারী স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, ব্রেকিং সক্ষমতা, ওজন ও ভারসাম্যসহ সামগ্রিক কারিগরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।


এদিকে সারাদেশের মহাসড়কে স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের করা আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম ও বিচারপতি মুরাদ-এ-মাওলা সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।


আদালত বলেছেন, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন এবং ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া বাসগুলোই কেবল সড়কে চলাচল করতে পারবে। কোনো বাস অনুমোদনহীন অবস্থায় সড়কে চললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের কোনো বাধা নেই।


হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে আইনজীবী রাফিউল ইসলাম গত বুধবার হাইকোর্ট চত্বরে দেওয়া এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, আদালত বলেছেন, শুধুমাত্র বিআরটিএ যেসব বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, সেগুলোই রাস্তায় চলবে। স্লিপার বাস চালানোর কোনো অনুমতি নেই এবং হাইকোর্টও স্লিপার বাস চলাচলের কোনো অনুমতি দেয়নি। ফলে বিআরটিএর অনুমোদন ও রুট পারমিট ছাড়া মহাসড়কে স্লিপার বাস চলাচলের সুযোগ থাকছে না। এ ধরনের বাসকে সড়ক পরিবহন আইন এবং নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য মেনেই চলাচল করতে হবে।


অর্থাৎ স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে শুধু যাত্রী পরিবহনের অনুমতি থাকাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট বাসের অনুমোদন, নিবন্ধন, রুট পারমিট, ফিটনেস এবং নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্যও নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


কক্সবাজারে অনুমোদনহীন স্লিপার বাস বন্ধের বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। অবৈধ স্লিপার বাস বন্ধে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।


তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি অভিযান চলমান থাকে এবং অনুমোদনহীন বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা থাকে, তাহলে কক্সবাজারের কলাতলী থেকে এসব বাস প্রতিদিন কীভাবে নিয়মিত যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। এ কারণে বাস মালিক ও অপারেটরদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের কলাতলীসহ সংশ্লিষ্ট বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালিয়ে প্রতিটি স্লিপার বাসের অনুমোদন, নিবন্ধন, রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীনভাবে রূপান্তরিত কোনো বাস পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দুর্ঘটনা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার চেয়ে আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : BanglaDock

কমেন্ট বক্স
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে