ডিম পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—প্রায় সব বয়সী মানুষের খাদ্যতালিকাতেই ডিম রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মধ্যে নানা উদ্বেগ রয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, কুসুম খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গিয়ে হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মানুষের জন্য ডিমের কুসুম একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমেও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
ডায়েটারি কনসালট্যান্ট ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমারের মতে, একটি ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালোরি ও ৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। এ ছাড়া ডিমে রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
বিশেষ করে ডিমের কুসুমে থাকে কোলিন, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী নারী ও গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেও কোলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কুসুমে থাকা লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এ ছাড়া ডিম থেকে ভিটামিন ডি, ফোলেট, আয়োডিন ও বি-ভিটামিনও পাওয়া যায়।
প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত—এর নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম খাওয়ার পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষ প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম খেতে পারেন। এখানে পুরো ডিম অর্থাৎ সাদা অংশের সঙ্গে কুসুমও অন্তর্ভুক্ত।
ডিমের কুসুম নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এর কোলেস্টেরল। একটি কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে। তবে খাবার থেকে শরীরে প্রবেশ করা কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। শরীর নিজেও প্রয়োজন অনুযায়ী কোলেস্টেরল তৈরি করে। খাবার থেকে কোলেস্টেরল গ্রহণ বাড়লে অনেক ক্ষেত্রে শরীর নিজস্ব কোলেস্টেরল উৎপাদন কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
হৃদরোগের ঝুঁকি বুঝতে রক্তের এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। এলডিএল অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ধমনিতে প্লাক জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে এইচডিএল বা ‘ভালো কোলেস্টেরল’ শরীর থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরাতে ভূমিকা রাখে।
তাই হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু খাবারে কতটা কোলেস্টেরল রয়েছে, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, বয়স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞের মতে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত ডিম খাওয়াকে হৃদরোগের বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখার কারণ নেই। এমনকি হৃদরোগীদের ক্ষেত্রেও ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বিবেচনা করে খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা যেতে পারে।
তবে যাদের বংশগতভাবে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়ার মতো জিনগত সমস্যায় রক্তে এলডিএলের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হতে পারে।
ডিমের কুসুম খেলে জন্ডিস হয় কিংবা কিডনির ক্ষতি হয়—এমন ধারণাও প্রচলিত। তবে ডা. অরুণ কুমারের মতে, এসব ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে ডিমের কুসুম খাওয়াকে জন্ডিস বা কিডনি ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার ক্ষেত্রে শুধু খাবারের কোলেস্টেরল নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাসের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু কুসুমে কোলেস্টেরল আছে—এই কারণে তা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ, ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল রয়েছে—এটি সত্য। কিন্তু শুধু এই কারণেই কুসুম খেলেই হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে পুরো ডিম খাওয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, কোলিন, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যেতে পারে। তবে রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে, হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে বা বংশগত কোলেস্টেরলজনিত সমস্যা থাকলে ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্ধারণ করাই নিরাপদ।
BanglaDock