কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে গত ১২ বছরে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে সাগরে ভেসে যাওয়া ১ হাজার ২০০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল নিশানা উপেক্ষা করে পানিতে নামা, লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার না করা এবং সৈকতের পানির নিচে থাকা গুপ্তখাল ও গর্ত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটকদের জন্য ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। লিফলেট, বিলবোর্ড ও ডিজিটাল মাধ্যমে এসব নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে নামতে হবে। লাল নিশানা চিহ্নিত স্থানে গোসল করা যাবে না এবং লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। বিকেল পাঁচটার পর সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকা, জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থা জেনে নেওয়া এবং লাইফগার্ড নেই এমন এলাকায় গোসল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভাসমান বস্তু নিয়ে পানিতে নামার আগে বাতাসের গতি সম্পর্কে জানা, শিশুদের একা সমুদ্রে নামতে না দেওয়া এবং অসুস্থ বা দুর্বল শরীর নিয়ে হাঁটুপানির বেশি গভীরে না যাওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
গত শুক্রবার কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম দেখা যায়। দুপুরে সেখানে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক ছিলেন, বিকেলে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯০ হাজারে পৌঁছায়। তাঁদের অনেকেই সাগরে গোসল করছিলেন। কেউ টিউবে ভেসে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছিলেন, আবার কেউ জেটস্কিতে চড়ে গভীর সাগরের দিকে যাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদেরও পানিতে নামতে দেখা যায়। তাঁদের অনেকেরই লাইফ জ্যাকেট ছিল না।
সৈকতের বিভিন্ন স্থানে লাল নিশানা উড়ছিল। লাইফগার্ডরা বাঁশি বাজিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, লাল নিশানা চিহ্নিত এলাকায় পানির নিচে গুপ্তখাল রয়েছে। সেখানে আটকা পড়লে বিপদের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু অনেক পর্যটক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গোসল করতে থাকেন।
বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের কর্মীরা সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকদের সতর্ক করছিলেন। সৈকতে স্থাপিত তিনটি ওয়াচ টাওয়ার থেকেও পানিতে নামা পর্যটকদের ওপর নজর রাখা হচ্ছিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় টিউব থেকে ছিটকে পড়া কয়েকজনকে লাইফগার্ড ও বিচের কর্মীরা উদ্ধার করে আনেন।
লাইফগার্ড ও বিচের কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্টের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত দেড় লাখ পর্যটক গোসলে নেমেছিলেন। এর আগের কয়েক দিনে নেমেছিলেন আরও অন্তত ছয় লাখ পর্যটক। শুক্রবার সাগরে ভেসে যাওয়া অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। ওই দিন এসব পয়েন্টে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সি-সেফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২১ অক্টোবর এক দিনেই আরও পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অল্প জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষ গোসল করতে নামলে লাল নিশানা বা সতর্কতামূলক পতাকার দিকে অনেকের নজর থাকে না। তাঁর মতে, হোটেল বা রিসোর্টে ওঠার সময় পর্যটকদের গোসলের ঝুঁকি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হলে তা কাজে আসতে পারে।
সৈকতে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে গুপ্তখাল ও বড় গর্তের কথা জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। সি-সেফের লাইফগার্ড প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বৈরী পরিবেশ, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সৈকতের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ১২ থেকে ১৫টি গুপ্তখাল ও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, জোয়ারের সময় এসব খাল ও গর্ত পানিতে ঢেকে যায়। ফলে পর্যটকেরা সেগুলোর অবস্থান বুঝতে পারেন না এবং সেখানে পড়ে বিপদে পড়েন। সৈকতে কেউ গর্তে আটকা পড়লে উদ্ধারের জন্য ডুবুরিরও অভাব রয়েছে।
ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, শহরের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে সি-সেফের ২৭ জন কর্মী কাজ করেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী ও টেকনাফ পর্যন্ত অরক্ষিত সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে কেউ নিখোঁজ হলে তাঁকে উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অথচ এসব এলাকাতেও পর্যটকেরা গোসল করতে নেমে বিপদে পড়ছেন।
জেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা বিচের কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকি নিয়ে গোসল করতে গিয়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক বিপদে পড়ছেন। জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থা না জেনেই অনেকে সাগরে নামেন। স্রোতের টানে কেউ ভেসে গেলে তাঁকে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, নিরাপদ গোসলের বিষয়ে পর্যটকদের বিভিন্নভাবে সচেতন করা হচ্ছে। তবে অনেকেই নির্দেশনা মেনে চলেন না। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক পর্যটক উন্মুক্ত সৈকতে নামলে তাঁদের সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শহরের পাঁচ কিলোমিটারের বাইরে অরক্ষিত সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে উদ্ধারকারী লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড ও ডুবুরি নিয়োগ এবং অরক্ষিত সৈকতে উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পর্যটকদেরও লাল নিশানা ও লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
BanglaDock