মানুষের জন্য মহান আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে ফলমূল অন্যতম। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন ফলের উল্লেখ এসেছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি, কুদরত ও নেয়ামতের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এসব ফলের কয়েকটি জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য পুরস্কার হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। খেজুর, জলপাই, ডুমুর, ডালিম, আঙুর ও কলা—কোরআনে উল্লেখিত এমন ছয়টি ফলের কথা তুলে ধরা হলো।
১. খেজুর: মরিয়ম (আ.)-এর জন্য আল্লাহর নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে খেজুর বা ‘নাখল’-এর উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে খেজুর মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। হজরত মরিয়ম (আ.) সন্তান প্রসবের বেদনায় কাতর হওয়ার সময় আল্লাহ তাঁকে খেজুর খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সুরা মরিয়মের ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি তোমার দিকে খেজুরগাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার ওপর সুপক্ব তাজা খেজুর ঝরে পড়বে।’
ইসলামি পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যা তাঁর ‘জাদুল মাআদ’ গ্রন্থে খেজুরের খাদ্যগুণ ও উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আজওয়া খেজুরের বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। সহিহ বুখারির ৫৪৪৫ নম্বর হাদিসে এসেছে, প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খেলে সেদিন বিষ ও জাদুর ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
২. জলপাই: বরকতময় গাছের ফল
পবিত্র কোরআনে জলপাই বা জয়তুনকে বরকতময় গাছের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নুরের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নুরের উপমা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘এটি প্রজ্বলিত করা হয় বরকতময় জয়তুন গাছের তেল দ্বারা, যা পূর্বদিকেরও নয়, পশ্চিমদিকেরও নয়।’
এ ছাড়া সুনানে তিরমিজির ১৮৫১ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জলপাইয়ের তেল খাওয়া ও শরীরে ব্যবহারের কথা বলেছেন। হাদিসে একে বরকতময় গাছ থেকে উৎপন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. ডুমুর: যে ফলের নামে সুরা
ডুমুরের আরবি নাম ‘তিন’। পবিত্র কোরআনে এই ফলের নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা রয়েছে—সুরা আত-তিন। সুরার প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘শপথ ডুমুর ও জয়তুনের।’
ইসলামি ব্যাখ্যাকার ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে ডুমুরের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায়, ফলটির প্রায় সব অংশই খাওয়ার উপযোগী। কোরআনে ডুমুরের নামে শপথের মাধ্যমে এই ফলের গুরুত্বও বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
৪. ডালিম: জান্নাতের ফলের বর্ণনায়
সুমিষ্ট ও দৃষ্টিনন্দন ফল ডালিমকে পবিত্র কোরআনে আরবি ‘রুম্মান’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায় সুরা আর-রহমানের ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাতে রয়েছে ফলমূল, খেজুর ও ডালিম।’
এ ছাড়া সুরা আল-আনআমের ৯৯ নম্বর আয়াতে ডালিম গাছের বৃদ্ধি ও ফলের বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করে আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৫. আঙুর: জান্নাতের পুরস্কারের বর্ণনায়
পবিত্র কোরআনে আঙুরের উল্লেখ একাধিকবার এসেছে। জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য পুরস্কারের বর্ণনায় সুরা আন-নাবার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই খোদাভীরুদের জন্য রয়েছে সফলতা; বাগবাগিচা ও আঙুরসমূহ।’
আঙুর কাঁচা ফল হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি শুকিয়ে কিশমিশ হিসেবেও সংরক্ষণ করা যায়। তাফসিরবিদ ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে আঙুরকে মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৬. কলা: জান্নাতের প্রশান্তির বর্ণনায়
জান্নাতের অধিবাসীদের আরাম ও প্রশান্তির বর্ণনায় পবিত্র কোরআনে কলার প্রসঙ্গ এসেছে। আরবি ‘তালহ’ শব্দটির অর্থ অধিকাংশ আলেমের মতে কলাগাছ।
সুরা আল-ওয়াকিয়াহর ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াতে জান্নাতের অধিবাসীদের অবস্থার বর্ণনায় বলা হয়েছে, তারা থাকবে ‘কাঁটাবিহীন কুলগাছের নিচে এবং স্তরে স্তরে সাজানো কলাগাছের নিচে।’
ইবনে কাসিরসহ একাধিক তাফসিরবিদের ব্যাখ্যায় ‘তালহ’ বলতে কলাগাছকে বোঝানো হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত এসব ফল মানুষের জন্য আল্লাহর নেয়ামত ও সৃষ্টির নিদর্শন। এগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ার খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি জান্নাতের নেয়ামতের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব নেয়ামত গ্রহণের পাশাপাশি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা রয়েছে কোরআনের বর্ণনায়।
BanglaDock