শরতের মেঘ-বৃষ্টি আর স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে নতুন রূপ পেয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ। এক পাশে বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়—এই বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
কক্সবাজার শহরের কলাতলী ডলফিন মোড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে ছড়িয়ে রয়েছে সমুদ্র, পাহাড়, বন ও গ্রামীণ জনপদের অপূর্ব সমন্বয়। শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কখনো রোদ আবার কখনো হালকা বৃষ্টি—সব মিলিয়ে সড়কটি হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টিতে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশের সবুজ আরও সতেজ ও গাঢ় হয়ে উঠেছে। কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে বৃষ্টির পানি, আবার কোথাও সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে পর্যটকবাহী গাড়ি। প্রকৃতির এই দৃশ্য উপভোগ করতে এবং ছবি তুলতে প্রতিদিনই মেরিন ড্রাইভে ভিড় করছেন পর্যটকরা। অনেকের কাছে হালকা বৃষ্টি ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

পর্যটকদের সুবিধার্থে কলাতলী ডলফিন মোড়ে রয়েছে ছাদখোলা চাঁদের গাড়ি ও ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক স্টেশন। স্থানীয়ভাবে জিপ নামে পরিচিত এসব গাড়ি ঘণ্টা ও সারাদিনের হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। পর্যটন গাড়ি ব্যবস্থাপনায় থাকা আবুল কালাম জানান, ১০ থেকে ১২ জন ধারণক্ষমতার একটি গাড়ি সারাদিনের জন্য ভাড়া নিতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লাগে। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিলে ন্যূনতম ছয় ঘণ্টার জন্য গুনতে হয় ২ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতিদিন এখান থেকে হাজারেরও বেশি ট্রিপ ভাড়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডলফিন মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে এগোলে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। একদিকে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পাহাড়ি সবুজ। কোথাও সমুদ্র সড়কের একেবারে পাশে, কোথাও বালুকাবেলা ও ঝাউবনের আড়ালে। কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানেই বদলে যায় প্রকৃতির রং ও দৃশ্যপট। একই যাত্রায় সমুদ্র, পাহাড়, বন, গ্রামীণ জীবন ও বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি দেখার সুযোগই পর্যটকদের কাছে মেরিন ড্রাইভের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পর্যটক রাকিব হাসান বলেন, মেরিন ড্রাইভে একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা তার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে। গাড়ি চলার সময় দুই পাশে দুই ধরনের প্রকৃতি দেখা যায়, যা অন্য কোথাও খুব একটা পাওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, সন্তানরা সমুদ্র দেখতে চেয়েছিল। তবে মেরিন ড্রাইভে এসে পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতি দেখেও তারা মুগ্ধ হয়েছে। হালকা বৃষ্টির মধ্যেও সবাই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলেছে।
ইনানী পর্যটন স্পটে জার্মানির পর্যটক ম্যাক্সিমিলিয়ান ইয়েনাস বলেন, সমুদ্র ও বৃষ্টির সমন্বয় মেরিন ড্রাইভকে বিশেষ করে তুলেছে। সমুদ্রের পাশ দিয়ে পাহাড়ের মাঝখানে দীর্ঘ পথ চলার অভিজ্ঞতা তার কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সপরিবারে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা ইয়েনাস একজন ভ্রমণবিষয়ক ভ্লগারও। ইনানীর সৌন্দর্য ভিডিওতে ধারণ করার সময় তিনি এ কথা জানান।
মেরিন ড্রাইভে মোটরবাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও ঘুরতে আসছেন অনেকে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ একাই বেরিয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ে। হিমছড়ি পয়েন্টে বাইক আরোহী পর্যটক তানভীর আহমেদ বলেন, মেরিন ড্রাইভে কোথায় থামবেন, তা ঠিক করা কঠিন। কারণ কিছুদূর পরপরই নতুন কোনো দৃশ্য সামনে আসে।
মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামীণ জনপদ। ছোট ছোট ঘরবাড়ি, স্থানীয় মানুষের চলাচল, পাহাড়ি ছড়ায় জাল পেতে মাছ ধরা, পাহাড়ের পাদদেশের সবুজ ও কৃষিকাজ—সব মিলিয়ে পর্যটকদের সামনে কক্সবাজারের ভিন্ন এক জীবনচিত্র তুলে ধরে এই সড়ক।
স্থানীয় সাংবাদিক জসিম উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার মানেই শুধু দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত—এ ধারণার বাইরে মেরিন ড্রাইভ পর্যটকদের সামনে সমুদ্র, পাহাড় ও গ্রামীণ প্রকৃতির আরেকটি রূপ তুলে ধরেছে। পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ ঘিরে ছোট ব্যবসা, খাবারের দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটনসেবার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিবেশের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, মেরিন ড্রাইভের আসল আকর্ষণ কোনো কৃত্রিম স্থাপনা নয়; এর শক্তি প্রকৃতির নিজস্ব বৈচিত্র্যে—এক পাশে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে আঁকাবাঁকা সড়ক।
BanglaDock