সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের সবুজ, দীর্ঘ বালুকাবেলা আর নীল আকাশ- প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় আয়োজন একসঙ্গে দেখা যায় কক্সবাজারে। দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজার শুধু দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের জন্যই নয়, পাহাড়, বন, দ্বীপ, নদী ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কারণেও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই কক্সবাজার হয়ে ওঠে দেশের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম বড় প্রতীক।
কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের বিভিন্ন অংশে প্রকৃতির রূপ বদলে যায়। শহরের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকলেও একটু দূরে গেলেই পাওয়া যায় অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি সৈকত। ভোরের সূর্যোদয়, বিকেলের সোনালি আলো কিংবা সন্ধ্যায় ঢেউয়ের গর্জন- প্রতিটি সময়েই সৈকতের আলাদা সৌন্দর্য চোখে পড়ে।
কক্সবাজার শহর থেকে দক্ষিণে এগোলেই দেখা মেলে হিমছড়ির। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র- দুইয়ের এমন মিলন কক্সবাজার ভ্রমণকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। হিমছড়ির পাহাড়ি ঝরনা, সবুজের সমারোহ ও সমুদ্রের বিস্তৃত দৃশ্য পর্যটকদের টানে। পাহাড়ের ওপর থেকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি দেখার অভিজ্ঞতাও আলাদা।
হিমছড়ি পেরিয়ে আরও দক্ষিণে গেলে ইনানী সমুদ্রসৈকত। প্রবাল ও পাথরের বৈচিত্র্যময় গঠন, স্বচ্ছ নীল জল আর বিস্তৃত বালুকাবেলা ইনানীকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জোয়ার-ভাটার সময় বদলে যায় সৈকতের দৃশ্যপট। সূর্যাস্তের সময় ইনানীর সৌন্দর্য আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে।
ইনানীর আশপাশে পাটুয়ারটেকও দিন দিন পর্যটকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ, পাথুরে সৈকত ও পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি এখানে ভ্রমণপ্রেমীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটাতে চান- এমন পর্যটকদের জন্য এসব স্পট হয়ে উঠছে জনপ্রিয় গন্তব্য।
কক্সবাজারের পর্যটন মানচিত্রে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অবস্থানও বিশেষ। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মাঝে প্রবালদ্বীপটির স্বচ্ছ পানি, নারকেলগাছ আর বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তবে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা এখন বড় বিষয়।
কক্সবাজারের আরেক আকর্ষণ মহেশখালী। সমুদ্রবেষ্টিত এই দ্বীপে পাহাড়, ম্যানগ্রোভ, লবণ মাঠ এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য দেখা যায়। আদিনাথ মন্দিরকে ঘিরে মহেশখালীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সোনাদিয়াও হতে পারে ভিন্নধর্মী গন্তব্য। দ্বীপটির উপকূলীয় পরিবেশ, পাখির বিচরণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য কক্সবাজারের পর্যটনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। বিশেষ করে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য দেখতে আগ্রহী পর্যটকদের কাছে এ ধরনের স্থান গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের পর্যটন শুধু সমুদ্রনির্ভর নয়। জেলার রামুতে রয়েছে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোডা, বুদ্ধমূর্তি ও স্থানীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রামুকে করেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয়। সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি এসব স্থানে ঘুরে একজন পর্যটক কক্সবাজারের ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
এ জেলার পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের জীবন ও অর্থনীতি। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটনসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে স্থানীয় হস্তশিল্প- সব ক্ষেত্রেই পর্যটকদের উপস্থিতির প্রভাব রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে বাড়ে কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম।
তবে কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পর্যটন, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে সৈকত ও দ্বীপাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই কক্সবাজার শুধু বেড়ানোর জায়গা নয়, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার একটি বড় প্রতিচ্ছবি। সমুদ্রের ঢেউ থেকে পাহাড়ের সবুজ, দ্বীপের নীরবতা থেকে প্রাচীন ঐতিহ্য- প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যকে টেকসইভাবে সংরক্ষণ করা গেলে কক্সবাজার হয়ে উঠতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।
লেখক: মেহেদী হাসান।
BanglaDock