কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারের পাশাপাশি মাদক পাচারেও একই সূত্রে একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী। তিনি বলেন, টেকনাফে মানব পাচার একটি ভয়াবহ সমস্যা। বর্তমানে অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে টেকনাফ উপজেলা পরিষদ সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহায়তায় এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, মানব পাচার বন্ধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। পাচার রোধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলোর মধ্যে টেকনাফ ও উখিয়া অন্যতম। মানব পাচার ও অবৈধভাবে মানুষ বিদেশে পাঠানো বন্ধ করতে গ্রাম পর্যায়ে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগ জোরদার এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক সভার আয়োজন প্রয়োজন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, মানব পাচার বন্ধে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মলকা বানু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইসমাইল বলেন, টেকনাফে মানব পাচারের সঙ্গে পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ জড়িত। শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিরা এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে বেশি পড়েন। তাই বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
কর্মশালায় মালয়েশিয়াফেরত অভিবাসী মো. ইমাম হোসেন নিজের পাচারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালে মানব পাচারের শিকার হন তিনি। দালালেরা তাঁকে ও আরও কয়েকজনকে জোর করে নৌকায় তুলে নিয়ে নির্যাতন করে। পরে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করে পাচার করা হয়। ব্র্যাকের সহায়তায় পরে দেশে ফিরে আসেন তিনি। বর্তমানে একটি পানের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইমাম হোসেন সবাইকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশে না যাওয়ার আহ্বান জানান। বিদেশ যাওয়ার আগে নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
কর্মশালায় বক্তারা আরও বলেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া বিদেশে গেলে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। তাই বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর অজিত নন্দী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যান্টি ট্রাফিকিং ক্যাম্পেইনের ম্যানেজার শাহনাজ পারভীন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কক্সবাজার সেন্টার ম্যানেজার মো. আজিমুল হক।
কর্মশালায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা, টেকনাফ মডেল থানার প্রতিনিধি, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ইমাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি, ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য, গ্রাম পুলিশ, কমিউনিটি ও যুবনেতা, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক এবং মানব পাচার ও অভিবাসনে প্রতারিত ব্যক্তিরা অংশ নেন। এ ছাড়া ব্র্যাক ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
BanglaDock